1. hridoynews3355@gmail.com : Hridoypress : Hridoy Ahmed
  2. talukderkajal@gmail.com : Kajal Talukder : Kajal Talukder
  3. mahabubalama1993@gmail.com : Mahabub Alam : Mahabub Alam
  4. netrakonalive@gmail.com : NETRAKONA LIVE : NETRAKONA LIVE
  5. mdkayeasahmed@gmail.com : MD KAYEAS AHMED : MD KAYEAS AHMED
ঢাকা ০৫:২০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৮ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সীমান্তের শব্দযোদ্ধা অন্তর হাজং

নেত্রকোণা লাইভ অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

হৃদয় আহমেদ, কলমাকান্দা (নেত্রকোনা)

সীমান্তের ভোরগুলো আলাদা। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে কুয়াশা গড়িয়ে আসে, দূরে ভেসে আসে ধানের ক্ষেতে কাজের ডাক। কোথাও ভেসে আসে মৃদু সুর—আবার পূজা-আর্চনার ধ্বনি। কিন্তু এই জনপদে ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসছে এক সুর—হাজং ভাষার সুর। সেই ক্ষীণ সুরকে আবার জীবিত করার জন্য ছয় বছর ধরে পথ হাঁটছেন এক তরুণ— নাম তার অন্তর হাজং।

ভোরের হালকা আলো মাটির পথ স্পর্শ করার আগেই, অন্তর তার ব্যাগে খাতা, কলম ও পুরনো ডায়েরি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। গ্রামের পথগুলো কাঁটাছেঁড়া—কখনো কাঁচা, কখনো পাহাড়ি ঢাল। তাঁর চোখে শুধু পথ নয়, প্রতিটি গ্রাম, প্রতিটি বাড়ি যেন নতুন সম্ভাবনার ভাণ্ডার।

পাহাড়ি গ্রামে শব্দের খোঁজ

কলমাকান্দা–দুর্গাপুর সীমান্তের হাজংদের গ্রামগুলোতে অন্তর পৌঁছান প্রবীণদের কাছে। বসে শোনেন পুরনো দিনের গল্প, নীরবতার মধ্যে খুঁজে বের করেন হারিয়ে যাওয়া শব্দ, বাক্য, গান। প্রতিটি কথোপকথন যেন একটি জীবন্ত ইতিহাস।

দুপুরের আলো পড়তে শুরু করলে শুরু হয় ছোট্ট ভাষা-আসর। শিশুরা গোল হয়ে বসে, নারী ও পুরুষরা আগ্রহভরে শুনছে। অন্তর গল্পের ছলে, ছড়ার ছলে, গান বা কবিতার সুরে শেখান শব্দ ও বাক্য। “মাটি, আকাশ, নদী, মা”—এই শব্দগুলো প্রথমবার উচ্চারণের সময় শিশুরা হেসে আনন্দ ভাগ করে নেয়। অনেকের মনে জেগে ওঠে শৈশবের স্মৃতি, যখন দাদু-নানু নিজ ভাষাতেই গল্প বলতেন।

কলমাকান্দার ভাষা-আসর

কলমাকান্দার লেঙ্গুরা, নলছাপ্রা ও সীমান্তঘেঁষা গ্রামগুলোতে অন্তরের ভাষা-চক্র নিয়মিত বসে। বাড়ির উঠোনে ত্রিপল বিছিয়ে, কখনো স্কুলের খালি ঘরে, কখনো গাছের ছায়ায়—শিশু, কিশোর, নারী ও বয়োবৃদ্ধরা একসাথে শিখছে। শিক্ষার্থীরা শুধু শব্দ শিখছে না; সংস্কৃতি, পরিচয় ও আত্মসম্মানও শিখছে। স্থানীয়রা বলেন, “অন্তর আমাদের হারিয়ে যাওয়া ভাষার জন্য নতুন জীবন দিচ্ছেন।”

হাজংদের গ্রামে একদিন

শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারী) সকালে সীমান্তের পাহাড়ের গ্রাম গোপালবাড়ি গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে —তাঁর বাড়ির উঠানে ত্রিপল বিছিয়ে হাজং সম্প্রদায়ের ছেলে, মেয়ে, গৃহিণীসহ বিভিন্ন বয়সী ২৫ জন বসে আছেন। অন্তর দাঁড়িয়ে তাঁদের নানা শব্দ ও বাক্য শেখাচ্ছেন। তিনি কখনো গল্পের ছলে, কখনো হাজং ভাষায় গীত করে, কখনো আবার গান বা কবিতার ছলে শেখাচ্ছেন। শিক্ষার্থীরাও বেশ মজা পাচ্ছেন।

বর্ণহীন ভাষার সংগ্রহ

হাজং ভাষার নিজস্ব কোনো বর্ণমালা নেই। তাই সংরক্ষণ শুধু মুখে নয়—লিপিবদ্ধ করতেই হবে। অন্তর প্রতিটি গ্রামে প্রবীণদের সঙ্গে বসে সংগ্রহ করেন শব্দ, গান, কেচ্ছা-কাহিনি, পূজা-অর্চনার মন্ত্র। বাংলা হরফে উচ্চারণভিত্তিকভাবে লিখে রাখেন শব্দ ও অর্থ। এ পর্যন্ত ৮২৬টির বেশি শব্দ লিপিবদ্ধ করেছেন। প্রতিটি শব্দ তাঁর কাছে কেবল শব্দ নয়, বরং একটি গল্প, একটি স্মৃতি, একটি পরিচয়।

১০১ গ্রামের অভিযাত্রা

পার্শ্ববর্তী দূর্গাপুর উপজেলার কুল্লাগড়া গ্রাম থেকে শুরু হওয়া অন্তরের অভিযান এখন কলমাকান্দা সীমান্ত ছাড়িয়ে শেরপুর ও সুনামগঞ্জের কিছু গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে। মোট ১০১টি গ্রামে তিনি হাজং ভাষার ছোঁয়া দিয়েছেন। আনুমানিক প্রায় ২০ হাজার মানুষের মধ্যে নতুন করে ভাষা শেখার আগ্রহ জাগানোর চেষ্টা করছেন। কোনো আনুষ্ঠানিক শ্রেণিকক্ষ নেই। উঠোন, গাছতলা বা স্কুলের ফাঁকা ঘরে—যেখানে সুবিধা, সেখানেই শেখানো হয়। শিশু, নারী, পুরুষ, বয়োবৃদ্ধ—সবাই শিক্ষার্থী, সবাই শিক্ষকের ভূমিকাও পালন করেন।

দরিদ্রতার ভেতর দৃঢ় প্রত্যয়

অন্তরের পরিবার দিনমজুর। ব্যক্তিগত টিউশনি করে যে সামান্য আয় হয়, সেখান থেকেই যাতায়াত ও খাতা-কলমের খরচ জোগান। তবু তাঁর স্বপ্ন থেমে নেই। প্রতিদিনের যাত্রা সহজ নয়—তবু থেমে থাকেন না। লক্ষ্য একটাই—ভাষা বাঁচানো এবং ভবিষ্যতের প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

সরকারি উদ্যোগের প্রত্যাশা

অন্তরের স্বপ্ন—সরকারি উদ্যোগে হাজং ভাষা বই-পুস্তকে লিপিবদ্ধ হোক। গবেষণার মাধ্যমে বর্ণরূপ নির্ধারণ হোক। প্রাক-প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষাভিত্তিক পাঠ্যবই চালু হলে শিশুদের শেখা সহজ হবে।

তিনি বলেন, “আমি একা যতদিন পারি চেষ্টা চালিয়ে যাব। কিন্তু ভাষা টিকাতে হলে সংগঠিত উদ্যোগের প্রয়োজন।”

ভাষা মানে আত্মপরিচয়

ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের ধারক। হাজং ভাষা টিকে থাকলে টিকে থাকবে লোকগান, আচার, বিশ্বাস ও জীবনধারার স্মৃতি।

কুয়াশাভেজা সীমান্তে আজও শোনা যায় নতুন উচ্চারণ। শিশুরা গুনগুন করে মাতৃভাষার সুর ফিরিয়ে আনছে। অন্তর হাজংয়ের ছয় বছরের এই লড়াই হয়তো নিঃশব্দ, তবু কলমাকান্দা উপজেলা আজ তার সাক্ষী—একটি ভাষার পুনর্জাগরণের নিঃশব্দ প্রত্যয়।

Facebook Comments Box

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

ট্যাগস :
  • প্রকাশের সময় : ০৪:৩০:১৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২৬ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
    • আপনি কি নেত্রকোণা লাইভ এর নিয়মিত দর্শক..?

      View Results

      Loading ... Loading ...
  • পুরনো ফলাফল
    Logo
    শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৮ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
    ফজর3:40 am
    জোহর11:58 am
    আসর4:38 pm
    মাগরিব6:44 pm
    ইশা8:12 pm
    সূর্যোদয় - 5:07 amসূর্যাস্ত - 6:44 pm

    সীমান্তের শব্দযোদ্ধা অন্তর হাজং

    প্রকাশের সময় : ০৪:৩০:১৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

    হৃদয় আহমেদ, কলমাকান্দা (নেত্রকোনা)

    সীমান্তের ভোরগুলো আলাদা। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে কুয়াশা গড়িয়ে আসে, দূরে ভেসে আসে ধানের ক্ষেতে কাজের ডাক। কোথাও ভেসে আসে মৃদু সুর—আবার পূজা-আর্চনার ধ্বনি। কিন্তু এই জনপদে ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসছে এক সুর—হাজং ভাষার সুর। সেই ক্ষীণ সুরকে আবার জীবিত করার জন্য ছয় বছর ধরে পথ হাঁটছেন এক তরুণ— নাম তার অন্তর হাজং।

    ভোরের হালকা আলো মাটির পথ স্পর্শ করার আগেই, অন্তর তার ব্যাগে খাতা, কলম ও পুরনো ডায়েরি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। গ্রামের পথগুলো কাঁটাছেঁড়া—কখনো কাঁচা, কখনো পাহাড়ি ঢাল। তাঁর চোখে শুধু পথ নয়, প্রতিটি গ্রাম, প্রতিটি বাড়ি যেন নতুন সম্ভাবনার ভাণ্ডার।

    পাহাড়ি গ্রামে শব্দের খোঁজ

    কলমাকান্দা–দুর্গাপুর সীমান্তের হাজংদের গ্রামগুলোতে অন্তর পৌঁছান প্রবীণদের কাছে। বসে শোনেন পুরনো দিনের গল্প, নীরবতার মধ্যে খুঁজে বের করেন হারিয়ে যাওয়া শব্দ, বাক্য, গান। প্রতিটি কথোপকথন যেন একটি জীবন্ত ইতিহাস।

    দুপুরের আলো পড়তে শুরু করলে শুরু হয় ছোট্ট ভাষা-আসর। শিশুরা গোল হয়ে বসে, নারী ও পুরুষরা আগ্রহভরে শুনছে। অন্তর গল্পের ছলে, ছড়ার ছলে, গান বা কবিতার সুরে শেখান শব্দ ও বাক্য। “মাটি, আকাশ, নদী, মা”—এই শব্দগুলো প্রথমবার উচ্চারণের সময় শিশুরা হেসে আনন্দ ভাগ করে নেয়। অনেকের মনে জেগে ওঠে শৈশবের স্মৃতি, যখন দাদু-নানু নিজ ভাষাতেই গল্প বলতেন।

    কলমাকান্দার ভাষা-আসর

    কলমাকান্দার লেঙ্গুরা, নলছাপ্রা ও সীমান্তঘেঁষা গ্রামগুলোতে অন্তরের ভাষা-চক্র নিয়মিত বসে। বাড়ির উঠোনে ত্রিপল বিছিয়ে, কখনো স্কুলের খালি ঘরে, কখনো গাছের ছায়ায়—শিশু, কিশোর, নারী ও বয়োবৃদ্ধরা একসাথে শিখছে। শিক্ষার্থীরা শুধু শব্দ শিখছে না; সংস্কৃতি, পরিচয় ও আত্মসম্মানও শিখছে। স্থানীয়রা বলেন, “অন্তর আমাদের হারিয়ে যাওয়া ভাষার জন্য নতুন জীবন দিচ্ছেন।”

    হাজংদের গ্রামে একদিন

    শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারী) সকালে সীমান্তের পাহাড়ের গ্রাম গোপালবাড়ি গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে —তাঁর বাড়ির উঠানে ত্রিপল বিছিয়ে হাজং সম্প্রদায়ের ছেলে, মেয়ে, গৃহিণীসহ বিভিন্ন বয়সী ২৫ জন বসে আছেন। অন্তর দাঁড়িয়ে তাঁদের নানা শব্দ ও বাক্য শেখাচ্ছেন। তিনি কখনো গল্পের ছলে, কখনো হাজং ভাষায় গীত করে, কখনো আবার গান বা কবিতার ছলে শেখাচ্ছেন। শিক্ষার্থীরাও বেশ মজা পাচ্ছেন।

    বর্ণহীন ভাষার সংগ্রহ

    হাজং ভাষার নিজস্ব কোনো বর্ণমালা নেই। তাই সংরক্ষণ শুধু মুখে নয়—লিপিবদ্ধ করতেই হবে। অন্তর প্রতিটি গ্রামে প্রবীণদের সঙ্গে বসে সংগ্রহ করেন শব্দ, গান, কেচ্ছা-কাহিনি, পূজা-অর্চনার মন্ত্র। বাংলা হরফে উচ্চারণভিত্তিকভাবে লিখে রাখেন শব্দ ও অর্থ। এ পর্যন্ত ৮২৬টির বেশি শব্দ লিপিবদ্ধ করেছেন। প্রতিটি শব্দ তাঁর কাছে কেবল শব্দ নয়, বরং একটি গল্প, একটি স্মৃতি, একটি পরিচয়।

    ১০১ গ্রামের অভিযাত্রা

    পার্শ্ববর্তী দূর্গাপুর উপজেলার কুল্লাগড়া গ্রাম থেকে শুরু হওয়া অন্তরের অভিযান এখন কলমাকান্দা সীমান্ত ছাড়িয়ে শেরপুর ও সুনামগঞ্জের কিছু গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে। মোট ১০১টি গ্রামে তিনি হাজং ভাষার ছোঁয়া দিয়েছেন। আনুমানিক প্রায় ২০ হাজার মানুষের মধ্যে নতুন করে ভাষা শেখার আগ্রহ জাগানোর চেষ্টা করছেন। কোনো আনুষ্ঠানিক শ্রেণিকক্ষ নেই। উঠোন, গাছতলা বা স্কুলের ফাঁকা ঘরে—যেখানে সুবিধা, সেখানেই শেখানো হয়। শিশু, নারী, পুরুষ, বয়োবৃদ্ধ—সবাই শিক্ষার্থী, সবাই শিক্ষকের ভূমিকাও পালন করেন।

    দরিদ্রতার ভেতর দৃঢ় প্রত্যয়

    অন্তরের পরিবার দিনমজুর। ব্যক্তিগত টিউশনি করে যে সামান্য আয় হয়, সেখান থেকেই যাতায়াত ও খাতা-কলমের খরচ জোগান। তবু তাঁর স্বপ্ন থেমে নেই। প্রতিদিনের যাত্রা সহজ নয়—তবু থেমে থাকেন না। লক্ষ্য একটাই—ভাষা বাঁচানো এবং ভবিষ্যতের প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

    সরকারি উদ্যোগের প্রত্যাশা

    অন্তরের স্বপ্ন—সরকারি উদ্যোগে হাজং ভাষা বই-পুস্তকে লিপিবদ্ধ হোক। গবেষণার মাধ্যমে বর্ণরূপ নির্ধারণ হোক। প্রাক-প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষাভিত্তিক পাঠ্যবই চালু হলে শিশুদের শেখা সহজ হবে।

    তিনি বলেন, “আমি একা যতদিন পারি চেষ্টা চালিয়ে যাব। কিন্তু ভাষা টিকাতে হলে সংগঠিত উদ্যোগের প্রয়োজন।”

    ভাষা মানে আত্মপরিচয়

    ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের ধারক। হাজং ভাষা টিকে থাকলে টিকে থাকবে লোকগান, আচার, বিশ্বাস ও জীবনধারার স্মৃতি।

    কুয়াশাভেজা সীমান্তে আজও শোনা যায় নতুন উচ্চারণ। শিশুরা গুনগুন করে মাতৃভাষার সুর ফিরিয়ে আনছে। অন্তর হাজংয়ের ছয় বছরের এই লড়াই হয়তো নিঃশব্দ, তবু কলমাকান্দা উপজেলা আজ তার সাক্ষী—একটি ভাষার পুনর্জাগরণের নিঃশব্দ প্রত্যয়।

    Facebook Comments Box