মগড়া নদীর বুকফাটা চিৎকার, আমি বাঁচতে চাই
মোঃ খোকন
একটি নদী যার নাম মগড়া।নেত্রকোণার আদি ঐতিহ্য। নেত্রকোণা শহরকে পরিকার মতো করে শতাব্দীর পর শতাব্দ ধরে রক্ষা করে আসা মগড়া নদীটি আজ প্রায় বিলীন হওয়ার পথে কিন্তু উদ্ধারে নেই কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ। দখলে দখলে শীর্ণকায় ঐতিহ্যবাহী মগড়া এখন মৃত প্রায়। শহরবাসীও এটিকে ময়লার ভাগাড়ে পরিণত করায় বর্ষা মৌসুমে পানিতে ভরলেও সম্পূর্ণ ব্যবহার অনুউপযোগী । শুকনো মৌসুমে পানিই থাকে না।
দীর্ঘদিনের আন্দোলন সংগ্রামের পর নদী পুনঃজীবিতকরণ প্রকল্প পাস হয়ে মেয়াদের অর্ধেক সময় চলে গেলেও শুরুই হয়নি এখনো কার্যক্রম। তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি সময়ের মধ্যেই শুরু হবে।
দখলে দূষণে এক সময়ের খরস্রোতা ঐহিত্যবাহী মগড়া এখন মৃতপ্রায়। যাকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠা নেত্রকোনা শহর। কিন্তু কয়েক দশক ধরে নদীর দুই পাড় দখল করে গড়ে ওঠেছে শত শত অবৈধ স্থাপনা। এছাড়াও নদীর বুকে ফেলা হয় বাসাবাড়ি, দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ময়লাসহ সকল বর্জ্র আবর্জনা।ফলে বর্ষাকালেও পানি থাকে দূষিত। দখল উচ্ছেদ করে খননসহ সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো দাবি জানালেও উদ্যোগ নেয়নি কোনো সরকারই।
বিগত ২০২০ সালের তথ্যমতে, ওয়েবসাইটে ৩১৬ টি দখল চিহ্নিত করলেও গত ৫ বছরে বেড়ে হয়েছে ৫ শতাধিক। ওই সময়ের সংশ্লিষ্টরা উদ্যোগ নিলেও কাগজে পত্রে দেখানো হয় দুই শতাধিক স্থাপনা উচ্ছেদ। কিন্তু বাস্তাবে সবগুলোই পূণরায় রয়েছে। সেইসাথে যে কয়েকটি স্থাপনা ভেঙে ছিল তার প্রত্যেকটি এখন রীতিমতো পাকা ও দালানে রূপ নিয়েছে। সেইসাথে বিভিন্ন ধর্মীয় ক্লাবসহ নানা প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে শহরের নাগড়া, সাতপাইসহ বেশ কিছু স্থানে। শহরের মোট ৬ কিলোমিটার জুড়ে এসব অবৈধ স্থাপনা নিয়ে প্রশাসন ও দখলদারদের মধ্যে ইঁদুর বিড়াল খেলা চলছে তালিকা প্রণয়নে।বারবার সভা সেমিনার হলেও তালিকা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে। সারা দেশে সিএস মূলে আদালতের নির্দেশনা থাকলেও নেত্রকোনায় তোয়াক্কা করছে না প্রভাবশালী মহল। আর এদের দাপটে প্রশাসনও যেন কপোকাত ।
এদিকে দশক ধরে নদী পাড়ের বাসিন্দাসহ সচেতন নাগরিক ও পরিবেশবাদীরা নদী উদ্ধারে নানা আন্দোলন সংগ্রাম করে নেত্রকোনা মগড়া নদী পুনঃজীবিতকরণ দাবি জানাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় অবশেষে দুই বছর মেয়াদী নদী পুনঃজীবিতকরণ প্রকল্প গত ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে অনুমোদন হলেও সভা সেমিনারেই সীমাবব্ধ। আগামী ২০২৭ জুনে মেয়াদ শেষ হবার কথা থাকলেও শুরুই হয়নি এখনো ।
স্থানীয় বাবন তালুকদার বলেন, ‘শহরের একমাত্র সৌন্দর্য যেমন এই নদী। তেমনি এই নদীর মাধ্যমেই এই শহরের প্রসার ঘটেছিল, ব্যবসা বাণিজ্যের মাধ্যমে। দেশব্যাপী চলাচলের একমাত্র মাধ্যম ছিল নৌপথ। লঞ্চ স্টিমার ও পাল তোলা নৌকা দেখে বড় হয়েছি। আর এখন এই নদীর পাড় গুলো দখল করে নদীটি মৃত হয়ে গেছে। এখন কেবল এই নদীর দাফন বাকী।’
নদীপাড়ের বাসিন্দা অপু সরকার, শুভ বণিক, মুরিদা রহমান জানান, নদীতে যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা ফেলে ভাগাড়ে পরিণত করেছে। এর পানিও দূষিত হয়েছে। স্নান গোসল করতে পারে না কেউ। শরীর চুলকায়। অথচ এই নদী সিংহভাগ মানুষের পানি ব্যবহারের অন্যতম মাধ্যম ছিল।
পরিবেশকর্মী মো. অহিদুর রহমান বলেন, ‘এই নদীর মৃত্যু সনদ কে দেবে? বুড়িগঙ্গাসহ অনেক নদী হতে আদালতের নির্দেশনায় উচ্ছেদ কার্যক্রম করলেও এই নেত্রকোনায় পারছে না। কোথায় বাঁধা এইটা সবাই জানে। কিন্তু কেউ দখলদারদের বিপক্ষে যায় না। একবার উদ্যোগ নিয়েও সফল হতে পারেনি। এখানকার দখলদাররা সরকারের চেয়েও শক্তিশালী। তারা সব দলের সময় শক্তিশালী। অথচ নদী একটি জীবন্ত সত্ত্বা। এবার একটি প্রকল্প আসলেও এক বছর শেষ। আগামী বছরের জুনে মেয়াদ শেষ। কিন্তু কোনো কাজই শুরু হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের একার পক্ষে সম্ভব নয়। উচ্ছেদ কাজে স্থানীয় প্রশাসনেরও সহযোগিতা লাগবে। কিন্তু এই কাজ কবে হবে কেউ জানেনা। আদৌ তারা এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করে এই নদীর জীবন ফিরবে কিনা এ নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।’
বিশিষ্ট সাংবাদিক নুরুল হুদা বলেন, আমরা ভাটি অঞ্চলের মানুষ। নদীপথ আমাদের জন্য অতীত গুরুত্বপূর্ণ। এই মগড়া নদীর সাথে মিশে আছে আমাদের শৈশবের, কৈশোর ও যৌবন।এটা আমাদের জন্য অমুল্য সম্পদ।এটির সংরক্ষণ, পুনঃ খনন ও দখল উচ্ছেদে প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
এদিকে সংশ্লিষ্ট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো সাখাওয়াত হোসেন বলছেন, দখল চিহ্নিতকরণ ও তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। টেন্ডার প্রক্রিয়াও শেষ। দ্রুত সময়ের মধ্যেই শুরু হবে কাজ।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সুখময় সরকার বলেন, ‘আদালতে মামলা থাকায় তালিকাসহ অন্যান্য কাজ চলছে। তবে উচ্ছেদ একটি জটিল কাজ, জনপ্রতিনিধিদের নিয়েই করতে হবে। আমাদের একা করা সম্ভব নয়।’
তিনি বলেন, ‘৪৯টি মামলা চলমান থাকায় নিস্পত্তির কাজ দ্রুত কারার প্রক্রিয়া চলছে। অনেক গুলো রায় আমাদের পক্ষে আসলেও আবার আপিলও হয়েছে কিছু। এসবের কাজ শেষ করে জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে একটি স্টেকহোল্ডার সভা করেই এই কার্যক্রম শুরু হবে।’
সময় টিভির অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত সংবাদ ও পাউবো সূত্রে জানা গেছে, ৪৮ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ব্যায়ে নেত্রকোনা সদর থেকে আটপাড়া পর্যন্ত ৪১ কিলোমিটার খনন কাজ করা হবে। দখলদারদের দায়ের করা মামলা চলমান রয়েছে ৪৯ টি।















